bangladesh
ads

কালাম স্যার ও একটি আর্তনাদ

[ ctgreportbd | on August 28, 2017]

কামরুল নাজিম ।।  একটি লেখা শুরু করার পর আমি অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করেছি, লেখাটি আমি টেনে নিতে পারছি না কোনভাবেও। যেন পৃথিবীর সব শব্দ নিমিষেই হারিয়ে গেছে, কিংবা আমার সকল অনুভূতিই শুন্য হয়ে গেছে। আমি নির্বিকার বসে থাকি। আমার মনে হয়, পৃথিবীতে আমি কখনো ছিলাম না, হয়তো এখনো নেই, ভবিষ্যতেও থাকবো না। আমি মৃত্যু নিয়ে খুব ভাবি। অনেক বেশীই ভাবি। অথচ মৃত্যু নিয়ে তেমন ভয় নেই আমার। শুধুমাত্র এই বোধটুকু কাজ করে- আমার মা কি করবেন তখন, যখন শুনবেন আমি আর নেই! আমার বাবা কি বরাবরের মতই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন? আমার ছোট ভাইটি কিংবা আমার বোনেরা; তারা কি আসলেই বিশ্বাস করবে যে, তাদের ভাইটি নড়াচড়া করছে না আর! নাকি তারা আবার আমাকে জাগাতে চেষ্টা করবে? যেভাবে প্রতিটি সকালে জাগিয়ে দিতো ওসমান স্যার কিংবা কালাম স্যারের প্রাইভেটে যাওয়ার জন্য। আমি জানি, আমার বিদাইয়ে পৃথিবী তার কক্ষপথ থেকে এক চুলও সড়বে না। আমি এটাও জানি- আমি অবেলায় চলে গেলে, কিছু মানুষের পৃথিবী বলে আর কিছুই থাকবে না। দ্যাখুন, আমি বলছি, বিশ্বাস করুন, আমার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শোকগাঁথাটি আমি ছাড়া আর কেউ লিখতে পারবে না। মৃত্যু বরাবরের মতোই একটি বীভৎস ব্যাপার। তাই শোকগাঁথা নয়, আজ একটি গল্প বলি- একটি কণ্ঠস্বরের গল্প। যে স্বর চুপি চুপি বলে ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’ কিংবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বলে উঠে, ‘হাল ছেড়ো না কিন্তু, লড়ে যাও। মনে রাখবে এটাই জীবন।’ এই গল্পটি একটি সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখের গল্প। যেখানে থাকে আশাহত মানুষদের জন্য অনুপ্রেরণা। যেই মুখপানে তাকিয়ে তারা খুঁজে ফেরে বেঁচে থাকার পরমানন্দ। এই গল্পটি একজন সর্বজন প্রিয় রোমান্টিক হিরোর গল্প। গল্প, কবিতা, নাচ, গান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধূলা, রাজনীতি, অর্থনীতি তথা বর্তমান বিশ্ব সম্পর্কে সব মোহনীয় আলোচনায় যিনি অত্যান্ত চমকপ্রদ। এই গল্পটি সর্বোপরি একজন কালাম স্যারের গল্প। একটি ভালোবাসার গল্প। এক পরমাত্মার গল্প। যিনি এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে বেঁধে রেখেছেন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে। এই গল্পটি একটি প্রদীপ শিখার গল্প। যিনি বছরের পর বছর একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন লোকালয়ে বিতরণ করে চলেছেন সৃষ্টিশীলতার অনিন্দ্য আলো। কালাম স্যার খুব আস্তে আস্তে কথা বলেন। যেন সেখানে এক আনন্দ লুকিয়ে আছে। তিনি কথা বলেন আর মোহনীয় আমেজে শ্রোতাকে আকর্ষণ করেন। এমন শিল্পিত ভাব নিয়ে কেউ কথা বলতে পারে! কালাম স্যারের মুখোমুখি না হলে কেউ বুঝবে না তা। কালাম স্যার খুব ধীরে ধীরে হাঁটেন। যেন পায়ের প্রতিটি কদম তিনি গোনেন। দূর থেকে একবার তাকালে দেখা যায় সেই সুন্দর দৃশ্য। কালাম স্যার খুব আস্তে করে একটা দুটো কাশি দেন। কি আকর্ষণ সেখানে! আমি প্রায়ই সময় চেষ্টা করতাম স্যারের মত করে দু’একটা কাশি দিতে। কিন্ত পারি নি! কালাম স্যার ক্রিকেটের এক মস্তবড় ফ্যান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের পাঁড়ভক্ত তিনি। আরেকটা দলকে তিনি খুব সাফোর্ট করতেন। নাহ, ভারত, পাকিস্থান নয়, সে দেশটি শ্রীলঙ্কা। কালাম স্যার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করতেন ক্রিকেটীয় জটিল উপপাদ্য। আমার এখনো মনে আছে, ২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে মাশরাফি দল থেকে বাদ পড়ার পর কালাম স্যারও কি আপসেট হয়েছিলেন। পশ্চিমের জাহাজ এম ভি বার আউলিয়ায় স্যারের সাথে দেখা হয়েছিল আমার। কি ক্ষোভ থেকেই স্যার বলেছিলেন, গর্দভের দল সব। মাশরাফিকে রাখে রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে!

কালাম স্যার একজন মেসিভক্ত ফুটবল প্রেমী। কালাম স্যার এভাবেই বলতেন, ফুটবল সবাই খেলে, আবার মেসিও খেলে। যেদিন মেসি হ্যাটট্রিক করতো, কিংবা অসাধারণ কোন গোল করে দলকে জিতিয়ে দিতো, মেসিভক্ত হওয়ার কারনেই কিনা আমরা কালাম স্যারের দিকে তাকিয়ে একটু হাসতাম। দেখতাম কালাম স্যারের হাসি আরো চওড়া হয়েছে। এই হাসিটা আমাদের জন্য যতটুকু না সুখকর ছিল তারচেয়ে বেশী বেদনার ছিল রিয়াল মাদ্রিদ সাফোর্টারদের জন্য। আর কোন শিক্ষক কি খেলাধূলা নিয়ে ছাত্রদের সাথে এভাবে অবলীলায় মিশে যেতে পারতেন? আর কোন শিক্ষক কি খেলাধূলা নিয়ে প্রতিপক্ষ সমর্থক ছাত্রদের এভাবে খোঁচা মেরে কথা বলতে পারতেন। কালাম স্যার পারতেন। তিনি এখানেই অনন্য। কালাম স্যার একজন আপাদমস্তক সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। আমাদের রহমতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের শাখাটি স্যারের হাত ধরেই এগিয়ে চলছে এখনো। কালাম স্যারই কিনা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বইগুলো আমাকে পড়তে দিয়ে একটা নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এই পৌঢ় বয়সেও স্যার ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বই পড়েন। সর্বশেষ সাক্ষাতে স্যারের হাতে দুটো বই দিয়েছিলাম। কি যে খুশি হয়েছেন! কালাম স্যার আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। আমার কখনো মনে হয় নি কালাম স্যার ইংরেজিটা পড়ান। আমি সবসময় খেয়াল করতাম, স্যার ইংরেজিটা হাতে কলমে শিখিয়ে দিচ্ছেন তার ছাত্রদের। ইংরেজি গ্রামারগুলো স্যারের চেয়ে অধিক সুন্দর করে আর কেউ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারতো না। এত অল্প সময়ে আর কেউ সেসব এত সহজবোধ্য করে মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারতো না।

কালাম স্যার প্রায়ই বিকেলে স্কুল মাঠে আমাদের খেলা দেখতেন। খেলা শেষে তিনি দু’একজনকে ডাকতেন। চুপি চুপি বলতেন, ব্যাটিং বোলিং কিছুই তো তেমন পারো না। তারচেয়ে বরং কাল থেকে পড়তে এসো। কালাম স্যার এমনই ব্যক্তিত্ত্ব। টাকার অভাবে পড়তে না পারা এমন শতশত ছেলেকে স্যার এভাবে পড়তে আসতে বলতেন। দীর্ঘ দুই বছর কালাম স্যারের কাছে টানা প্রাইভেট পড়ে আমি কখনো দেখি নি, স্যার তার ছাত্রদের কাছ থেকে মাসিক বেতনটা চেয়েছেন। স্বেচ্ছায় যখন কেউ বেতন দিতো স্যার আস্তে করে বলতেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’। কি ভালোলাগা সেখানে! কালাম স্যার হচ্ছেন এমনই একজন ব্যক্তিত্ত্ব। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তিনি হলেন এমনই দেবদূত। যেন স্যারকে একবার ছুঁয়ে দেখলেই মন আনন্দে নেচে উঠে। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন তেমনই মহারাজ! শরতের মনোমুগ্ধকর নীলাকাশ আর তার উজ্জ্বল সুন্দর শুভ্র মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে আমি ফিরে যায় শৈশবের সেইসমস্ত রঙিন স্মৃতির রাজ্যে। সেইসব দিনগুলো, স্কুল পালানোর গল্প। চোখের পাতায় ভাসছে কালাম স্যারের অবয়ব। স্যার ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছেন, আস্তে আস্তে কথা বলছেন, সেই মোহনীয় ব্যক্তিত্ত্ব! শৈশবে যাকে অনুকরণ করার নিরন্তর চেষ্টা করতাম। আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যে খুব কাছ থেকে স্যারকে দেখেছি, খুব ঘনিষ্ঠভাবে স্যারের সাথে মিশেছি। স্যারের সাথে ছিল আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। স্মৃতির ভেলায় চড়ে পিছনে ফিরতে ফিরতে যেয়ে দেখি চোখ ভেসে উঠেছে জলে। শরতের নীলাকাশ যেন আরো গাঢ় নীল। আকাশের কোথাও সাদা মেঘ নেই। ঘন কালো মেঘেরা আচ্ছাদিত করে রেখেছে রৌদ্রজ্জল আকাশ। ভিতরটা হু হু করে উঠেছে এক নীল বিষাদে। সেদিন সকালে যখন শুনেছি কালাম স্যার ব্রেনস্ট্রোক করেছেন, তারপর থেকেই কেবল প্রমোদ গুনছি- ‘না না, কিচ্ছু হবে না, স্যার ফিরে আসবেন আবার। স্যার কথা বলবেন না- এ হতে পারে না! স্যার হাসপাতালের বেডে এভাবে শুয়ে থাকতে পারেন না! স্যার নিশ্চয় সুস্থ হবেন। দিন যায় একদিন, দু’দিন, তিনদিন….. কালাম স্যার এখনো কথা বলছেন না। সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা! স্যার কথা বলছেন না। ভিতরটা হু হু করে কেঁদে উঠে। একটা চাপা আর্তনাদ বুক ফেটে বেরিয়ে যায়- ‘আমাদের কালাম স্যার’! স্যারের জন্য প্রার্থনা চলে মসজিদে, মন্দিরে, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অন্তরের কাবায় সর্বত্র। একটু আশার সংকেত শুনি। স্যার ইম্প্রুভ করছেন। স্যারকে অপারেশন টেবিলে যেতে হবে। তবে এখনই নয়। মেডিক্যাল সায়েন্স যে তাদের অভিধান থেকে ‘রিস্ক’ শব্দটিকে বাদ দিতে পারেনি। আমাদের প্রাণটা আবারো কাঁদে। আবারো হাজার হাজার, লক্ষ হাত উপরের দিকে উঠে যায়- আমাদের কালাম স্যার। কালাম স্যার কখনো এমন নির্বিকার শুয়ে থাকেন নি, তিনি নিরন্তর ছুটে চলেছেন একটি আলোর মশাল হাতে। এতটা নির্বিকার তিনি কখনো ছিলেন না। কালাম স্যার এভাবে চুপ হয়ে যেতে পারেন না। এত সকালে আমাদের স্যাররা চুপ হয়ে গেলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনে যাবার প্রেরণা যোগানোর কেউ যে আর থাকবে না। আজ সন্ধ্যাটা আশা জাগানীয়া বাতাস বইয়ে এনেছে। প্রাণে প্রাণ ফিরেছে যেন। স্যারের জ্ঞান ফিরেছে। স্যার আবার উঠে দাঁড়াবেন, আবার হাঁটবেন ধীরপায়ে, আবার কথা বলবেন স্বল্পশব্দে, আবার কোন ছাত্রের পিঠে হাত বুলিয়ে বলবেন, পড়তে এসো কাল থেকে। আমাদের কালাম স্যার, আমরা আপনাকে খুব ভালোবাসি।

এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আবার দেখা হবে স্যারের সাথে। আবার স্যার বলবেন- ‘কামরুল, দেখা করতে আসছো খুব খুশি হয়েছি। এখন কি খাবা বলো।’ দু’একদিনের মধ্যেই অপারেশন হবে। আমাদের স্যারকে রাখুন আপনাদের একাগ্র প্রার্থনায়। আমাদের কালাম স্যার আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *