bangladesh
ads

সুরঞ্জনা, যেখানে সাধ যাও তুমি…

[ ctgreportbd | on June 28, 2017]

‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেওনাকো তুমি
বলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার’ (আকাশলীনা/জীবনানন্দ দাস)
না, প্রেমের কবিতা লিখতে বসিনি। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক কবিরা রোমান্সের কাতরতা দিয়ে চিরকাল কিভাবে নারীকে উড়িয়েছেন নাটাইয়ের টানে, সে সমীকরণ মেলাতে বসেছি। এই রোমান্স পুরুষের মনস্তত্ত্বে কিভাবে বপন করেছে নিয়ন্ত্রণকামীতার বীজ, নারীর মনস্তত্ত্বে ঢেলেছে সমর্পণের বিষ সে হিসেবটাও মেলাবো।  সমীকরণ মেলানোর আগে ইনবক্সে পাওয়া একটি জীবনের গল্প শুনে আসি, চলুন। ধরে নিন মেয়েটির নাম সুরঞ্জনা কিংবা মালবিকা।
‘ভালোবেসে বিয়ে করেছিল ওরা।  মেয়েটি স্বাধীনচিত্তের, লেখালেখি করে।  আর ছেলেটিও মননে অগ্রগামী, আধুনিক, নারী-পুরুষের সমতার কথা বলে। কিন্তু মেয়েটিকে ভালোবাসার কথা বলার সময় সে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল, ‘বলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে…’ না, কবিতার ভাষায় নয়, একেবারে পরিষ্কার করে বলেছিল, ‘তুমি কিন্তু এখন থেকে শুধুই আমার। অন্য ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা আমি কিন্তু আর মেনে নিতে পারবো না’। প্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মেয়েটি বুঝতেও পারেনি, রোমান্সের ছুরিতে সারাজীবনের জন্য ফালাফালা হতে চলেছে সে। না বুঝে ভেসে গিয়েছিল মেয়েটি। ভাসতে ভাসতে ভালোবাসার তরী থমকে দাঁড়ালো এক মধ্যরাতে তাদের ভালোবাসার ছোট্ট ঘরটিতে।

ছেলেটি তখন মাঝরাতের নিঃশব্দতায় হাতপাখার হাতা দিয়ে মারছিল মেয়েটিকে।  তাদের ভালোবাসাবাসির তিন মাসের সংসার।  মেয়েটির অপরাধ ছিল কোনও এক তরল মুহূর্তে মেয়েটি তার বন্ধুর গল্প করছিল।  মার খেয়ে হতভম্ব মেয়েটি শুধু বলতে পেরেছিল, ‘আমি তোমার সঙ্গে থাকবো না’।  তার উত্তরে ছেলেটি বলেছিল, ‘মাটিতে পুঁতে ফেলবো’। পাশের রুমে ঘুমিয়ে থাকা শ্বশুর-শাশুড়ি শুনতে পাবে বলে জোরে কাঁদেওনি মেয়েটি। তারপর কী হয়েছিল? বের হয়ে এসেছিল সুরঞ্জনা? না, বের হতে পারেনি।  কারণ, ছেলেটি প্রেম রোমান্স দিয়ে গায়ে হাত তোলাকে এমন করে গ্লোরিফাই করেছিল যে, একসময় মেয়েটি নিজেও বিশ্বাস করে ফেলে ভালোবাসলে মানুষ এমন আগ্রাসী হয়ে মারে।  প্রেমের ক্ষমতা!! হাহ হা!!

দ্বিতীয়বার যখন মেয়েটিকে মারে ছেলেটি তখন সে সাত মাসের প্রেগন্যান্ট। তারপরের বার তাদের দ্বিতীয় বাচ্চাটি পেটে।  এরপর থেকে বিভিন্ন ছুতোয় মেয়েটির গায়ে হাত তোলাটা অভ্যেস হয়ে গেলো।  চড় থাপ্পর নয়, চোর মারা মারে রক্তাক্ত হতে থাকলো সুরঞ্জনা।  তীব্র অপমানে একবার দুই সন্তানসহ ঘরে আগুন লাগিয়ে মরার চেষ্টা করেছিল মেয়েটি।  কিন্তু মরেনি।  মার খেয়েছে পড়ে পড়ে।  প্রতিবারই মার খাওয়ার পরে যখন রোমান্সের চাদরে মুড়ে ছেলেটি গায়ে হাত তোলাকে জাস্টিফাই করতো, তখন বোকা মেয়ে আঁচল বিছিয়ে গাইতো, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে, নিওনা সরায়ে…’।

সব কিছুরই শেষ আছে। সুরঞ্জনা মেয়েটির বোকামিরও শেষ হয় এক সময়। একদিন সুন্দর সকালে নিজের মতো বাঁচার মন্ত্র শিখে যায় সে। নিজের পেশা, লেখালেখি, বন্ধু-বান্ধব, নিজের সার্কেল তৈরি করে, ব্যস্ততার মাঝে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে নেয়। নিজেকে ভালোবাসতে শিখে যায়। ছেলেটি দেখে মেয়েটি আর তার চরণ ধরতে চায় না, ভালোবাসার বাণী দিয়ে তারে আর ভোলানো যায় না। তখন ছেলেটি ব্যবহার করে সেই বহুল ব্যবহৃত অব্যর্থ অস্ত্রটি। আকাশে বাতাসে রটিয়ে দিলো মেয়েটির চরিত্র খারাপ, পুরুষের সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়। মেয়েটির মা-বাবা-ভাই-বোন-ছেলে-মেয়ে সবাইকে ডেকে জানালো, সে কাজের নামে পুরুষের সঙ্গে রাত কাটায়। বাসার কাজের মেয়েটিকে পর্যন্ত জাোলো মেয়েটি পুরুষের সঙ্গে রাত কাটায় !!

তারপর ছেলেটি বেছে বেছে মেয়েটির কাজের জায়গাগুলোতে এমন সিনক্রিয়েট করতে শুরু করলো যে, মেয়েটির কাজের জায়গাগুলো ছোট হয়ে আসতে লাগলো। না না, কাজ করতে কখনও বাধা দেয়নি, সে আবার  নারীর এগিয়ে যাওয়ায় বিশ্বাস করে কিনা ! সে শুধু ঠিক করে দিতে থাকলো মেয়েটি কি কাজ করবে, কতক্ষণ কাজ করবে, কার সঙ্গে কাজ করবে, কার সঙ্গে মিশবে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে। এরপর আপত্তি শুরু হলো মেয়েটির সার্কেল নিয়ে।  শুধু যে ছেলে বন্ধু নিয়ে তার আপত্তি তা নয়, মেয়েটির অন্য যেকোনও সার্কেলেই তার আপত্তি। স্পষ্ট উচ্চারণে সে বলে দিলো, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার মন, তোমার সময়, তোমার কনসেন্ট্রেশন অন্য কেউ পাবে সেটি আমি কোনোভাবেই সহ্য করবো না।’’

কোনোভাবেই আর ছেলেটিকে ভালোবাসতে পারে না সুরঞ্জনা। এক সময় পুরোপুরি একা হয়ে গেলো সে। কিন্তু মেয়েটির একা থাকার শান্তিটুকুও ছেলেটি মানতে পারে না। মানতে পারে না তাকে ভালোবাসতে না পারাটা। কারণ, সে মেয়েটিকে ভালোবাসে, অতএব মেয়েটিকেও ভালোবাসতেই হবে। কখনও প্রেম, কখনও আদেশ, কখনও ভয় দেখানো কতকিছুই না করে ছেলেটি এখন মেয়েটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য। মেয়েটি আর ফিরে আসতে পারে না। তবু ছেলেটি জোর করে। মেয়েটি নিজের জন্য একটু সময় চায়। কিন্তু এই সময়টুকু দেওয়ার সময়ও ছেলেটির নেই। ছেলেটি বলে, “ফিরে এসো মালবিকা, ইচ্ছে করো, এখনই এসো!”

হায়রে পুরুষ!! ডাকে প্রেমের ভাষায়, কিন্তু প্রচ্ছন্ন থাকে হুকুম “ফিরে এসো, ইচ্ছে করো, এখনই  এসো!” এখনই!! হ্যা, এখনই। পুরুষ ডেকেছে নারীকে। সুতরাং যতই অনিচ্ছে থাকুক, ইচ্ছে তোমার করতেই হবে এবং সেটা এখনই। সে পুরুষের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে তোমার আদৌ আছে কিনা সে বিবেচনা মুখ্য নয়, মুখ্য পুরুষের ইচ্ছে। তোমার ইচ্ছে হবে কিনা তা তুমি ঠিক করবে না, সেটিও পুরুষই ঠিক করে দেবে। ওই পুরুষ তোমাকে চায়, অতএব, তুমি ইচ্ছে করো, এখনই এসো। চুলোর পাড়ে থাকো, আকাশে থাকো, পাতালে থাকো, তোমার প্রভু ডাক দিয়েছে, এখনই এসো!

রোমান্টিকতা এমনই এক রঙ্গীন হাতিয়ার যা দিয়ে পুরুষ চিরকাল নিঃসংকোচে নিয়ন্ত্রণ করেছে নারীর পছন্দ, প্রেম, মন, শরীর, সর্বোপরি জীবন। রোমান্সের নাটাইয়ে পুরুষ সুবিধেমতো নারীর সুতো ছেড়েছে, ইচ্ছেমতো টেনেছে। কখনও শক্তি প্রয়োগ করে, কখনও বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিছুতেই কাজ না হলে প্রেম-প্রেম ভাব ধরে ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেইল করে। নারীকে বারবার ফিরে আসতে হয়েছে পুরুষের নাটাইয়ের টানে।

নারী কার সঙ্গে মিশবে, কতটুকু মিশবে, কখন মিশবে, নারী- পুরুষের বন্ধুত্ব হবে, নাকি নারীতে নারীতে বন্ধুতে হবে, বন্ধুত্ব হলে কতটুকু হবে তার সবটুকুই ঠিক করে দেবে পুরুষ প্রভুরা। রাতে বউকে মেরে কালশিটে দাগ ফেলে, সকালে সে মারকে মহিমান্বিত করবে প্রেমের দাবি নিয়ে। প্রেমে নাকি সব জায়েজ!! নারীর মবিলিটি নিয়ে ইনসিকিউরিটিতে থাকা পুরুষ নারীকে নিজের কব্জায় রাখতে যত অস্ত্র আর কৌশল ব্যবহার করে, প্রেম হলো তার ভেতর সবচেয়ে কার্যকর ও সর্বশেষ অস্ত্র।

সে অস্ত্রেও যদি কাবু করতে না পারে, তখন সন্দেহবিকারগ্রস্ত পুরুষ গোঙায় “ কি কথা তাহার সাথে, তার সাথে?” যেন ওই যুবকের সঙ্গে কথা বলা মানেই তার সঙ্গে প্রেম করা !! তাতেও কাজ না হলে “মালবিকা জানো তুমি ঘাসে কি লবণ?” বলে প্রমাণ করতে চায়, সঠিক মানুষ পছন্দ করার বুদ্ধিটুকুও নারীর নেই!! আপাত প্রেমের ভাষায় উচ্চারিত হলেও এটিই চিরায়ত প্রভু পুরুষের অনুশাসন, যেখানে নারী কেবলই পুরুষের সম্পত্তি। নারী, মানুষ নয়, প্রাণ নয়, কেবলই পুরুষের শান্তির বড়ি।

বোকা পুরুষ জানে না, সুরঞ্জনা কিংবা মালবিকারা এখন পুরুষের এই প্রেমকে অবজ্ঞা করতে শিখে গেছে। এখন তারা প্রেমের ফাঁদ কেটে উড়ে উড়ে বেড়ায় জীবনের দিগন্তে। সে দিগন্তের কোনও সীমারেখা নেই। কোনও পুরুষের সন্দেহবিকারগ্রস্ত প্রেমের দায় নিয়ে জীবনের দাম চুকাতে রাজি নয় তারা আর। কি কথা তার সাথে? সুরঞ্জনারা এখন উচ্চারণ করতে শিখেছে, “আমারও তো যেতে ইচ্ছে করে। যাবো না কেনো? যাবো” ( তসলিমা নাসরিন)।

নিয়ন্ত্রণকামী পুরুষের লক্ষণরেখা ডিঙ্গিয়ে সুরঞ্জনারা এখন নতুন কবিতা লেখে,

“সুরঞ্জনা যেখানে সাধ যাও তুমি,

কথা বলো যতো খুশি যার সাথে

হৃদয়ের সাথে, ঝরাপাতার সাথে, বনময়ূরের পেখমের সাথে
সুরঞ্জনা, তোমার হৃদয়ে ঘাস নয়,

মনে রেখো, জীবন পাতা আছে

সে জীবনে ওড়ো আজ আকাশের ওপারে;

তোমার যেখানে সাধ যাও তুমি,

নক্ষত্রের রুপোলী আগুন ঝরা রাতে”

লেখক: নারীবাদী লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *