bangladesh
ads

‘ওরা বলেছিল ‘জয় বাংলা’ ফেলে দিতে’

[ ctgreportbd | on June 28, 2017]

দুইবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী মোরশেদুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে উঠে এলো চলচ্চিত্র আন্দোলনের সেইসব দিনের কথা।

আশির দশকে আলমগীর কবীরের ছায়ায় তারা যখন ছবি বানাতে শুরু করেছিলেন, তখন পথে ছিল স্বৈরাচার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিছানো কাঁটা। ছিল মূলধারার নির্মাতাদের উপহাস, অর্থ ও প্রযুক্তিগত অভাব। এরপরও কেবল দর্শকের জন্য নতুন ও ভালো কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে তিন তরুণ তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম আর তারেক মাসুদ পথে নেমেছিলেন ক্যামেরা হাতে।

গ্লিটজ : তারুণ্যের প্রথম থেকেই আপনি চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।  জীবনের কোন সময়টাতে  আপনি অনুভব করলেন যে আপনি চলচ্চিত্র নির্মাতাই হতে চান?

মোরশেদুল ইসলাম : আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আমি আগ্রহী ছিলাম। তখনই আমি ফিল্ম সোসাইটির মেম্বার হই এবং ছবি দেখা শুরু করি; দেশি-বিদেশী ছবি। এবং মনে হয় চলচ্চিত্র একটা শক্তিশালী মাধ্যম। চলচ্চিত্র ভালো লাগতো শুরুতে, কিন্তু চলচ্চিত্র যে নির্মাণ করতে পারি- সেই ভাবনাটা  মাথায় আসেনি। কারণ আমাদের সময় চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব কঠিন ছিল।  তখনও ভিডিও মাধ্যম ডিজিটাল হয়নি। চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হত ফিল্মে। সুতরাং ইচ্ছেটা ছিল, কিন্তু সেই ইচ্ছেটা যে কোনোদিন সত্যি হবে- তখনও ভাবিনি ।

তারপর কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটিতে যখন ভর্তি হলাম, ধীরে ধীরে ইচ্ছেটা আরও প্রবল হল। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, তখন একটা ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্সের আয়োজন করেছিল, তিন মাসের। সেই কোর্সে ভর্তি হওয়ার পরই কিন্তু চলচ্চিত্র সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা হল এবং মনে সাহস হলো যে হয়তো আমিও চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবো।

বিশেষ করে ওই কোর্সে আমাদের কোর্স পরিচালক ছিলেন আলমগীর কবীর। তিনি খুব উৎসাহ দিতেন। ছাত্রদের খুব অনুপ্রেরণা যোগাতে পারতেন। তিনিই সাহস যুগিয়েছিলেন বলা যায়। যে, ছবি নির্মাণ আসলে খুব কঠিন ব্যাপার নয়।

সেখান থেকেই সাহসটা পেলাম। এবং কোর্সটা যখন শেষ হলো, তারপরপরই  আমি আমার প্রথম ছবি যেটা, ‘আগামী’, তার স্ক্রিপ্ট লিখতে শুরু করি এবং এটি নির্মাণের প্রচেষ্টা শুরু করি। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র।

বাংলাদেশে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের সূচনা তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল আর আপনার হাত ধরে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনাদের বন্ধুত্বকে তুলনা করা যায় স্পিলবার্গ, ক্যামেরন আর স্করসেজি’র বন্ধুত্বের সঙ্গে, সত্তরের দশকে যারা হলিউডি ছবির দৃশ্যপটই পাল্টে ফেলেছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের অবস্থা কেমন ছিল?

মোরশেদুল ইসলাম: ওই সময় আসলে ছবি নির্মাণ একটা কঠিন ব্যাপার ছিল। ওই যে কোর্সটার কথা বললাম, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স- ওই কোর্সটা কিন্তু অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল। কারণ, ওই কোর্সের ছাত্র ছিলাম আমরা সবাই। তানভীর মোকাম্মেলও ওই কোর্সের ছাত্র ছিলেন। তারেক মাসুদও ছিলেন, তিনি যদিও থার্ড কোর্সটা করেছিলেন। প্রথম কোর্সের ছাত্র উনি ছিলেন না। কিন্তু তারেক মাসুদও সেসময় আসতেন। আমাদের সাথে তার একসাথেই আড্ডা হতো।

ফিল্ম আর্কাইভে তখন ভালো একটা লাইব্রেরিও ছিল। ওখানে আমরা বসতাম এবং চলচ্চিত্র নিয়ে নিজেদের ভাবনাগুলো শেয়ার করতাম। আরও অনেকেই কিন্তু সেই কোর্সের ছাত্র ছিলেন। চলচ্চিত্রকার শামীম আখতার, মানজারে হাসিন মুরাদ ভাইও কিন্তু ওই কোর্সের ছাত্র।

তখনই চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনাগুলো আসতে থাকে এবং যদিও আমরা বিচ্ছিন্নভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কিন্তু একটা সমন্বিত উদ্যোগেই আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়।

তানভীর মোকাম্মেল ‘হুলিয়া’ ছবিটি ওই কোর্সের পরেই নির্মাণ করেন। নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’ কবিতা থেকেই একটি চিত্রনাট্য লেখার জন্য ওই কোর্সে আমাদের একটি ক্লাসও নিয়েছিলেন সালাউদ্দীন জাকী স্যার। তিনি আমাদের চিত্রনাট্যের ক্লাস নিতেন। সবাই আমরা ওই ক্লাসে চিত্রনাট্য জমা দিয়েছিলাম। এবং তানভীর ভাই ওইটা দিয়েই তার ছবি নির্মাণ করলেন। আমি শুরু করলাম ‘আগামী’র কাজ।

প্রায় একইসাথে তারেক শুরু করলো ওর ডকুমেন্টারি ‘আদম সুরত’-এর কাজ, শিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে। এভাবেই  শুরু। যদিও আমার ছবিটা প্রথম মুক্তি পেল- ‘আগামী’, ১৯৮৪ সালে।

প্রতিবন্ধকতা যেগুলো ছিল , টেকনোলজির সঙ্গে আমাদের খুব একটা পরিচয় ছিল না, খুব অ্যাভেইলেবল ছিল না। ১৬ মিলিমিটারে আমরা তখন ছবি করেছি। ১৬ মিলিমিটারে কাজ করার সুবিধা খুব একটা ছিল না বাংলাদেশে। ক্যামেরা অনেক কষ্ট করে আমরা একটা জোগাড় করতে পেরেছিলাম। যদিও আলমগীর কবীরের একটা ক্যামেরা ছিল, সেটা আমরা ব্যবহার করতে পারতাম। ফিল্ম জোগাড় করাটা খুব ডিফিকাল্ট ছিল। তারপর ল্যাব- এফডিসিতে ১৬ মিলিমিটারের ল্যাবের কোনো ফ্যাসিলিটিজ ছিল না। ডিএফপিতে ছিল। ডিএফপিতে আমরা প্রসেসিং-এর কাজটা করতাম।

আরেকটা যে সমস্যা ছিল, সেটা রাজনৈতিক। তখন একটা স্বৈরাচার ক্ষমতায় ছিল- এরশাদ। পচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি একেবারে উল্টোপথে যাত্রা শুরু করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলাটাই তখন নিষিদ্ধ ছিল।

আমরা যেহেতু সবাই ছবি বানাতে শুরু করলাম, আমরা  ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমার বয়স ছিল ১৩। আমি ক্লাস এইটে পড়তাম। আর তাই মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের কাছে একেবারে জ্বলজ্বলে স্মৃতি। এবং আমাদের সবারই মনে হয়েছিল যে আমরা মুক্তিযুদ্ধকেই তুলে ধরবো।

যেমন আমার কথা যদি বলি, আমি যখন প্রথম ছবি কী নিয়ে বানাবো- এটা চিন্তা করলাম, তখন আমার মাথায় এলো, ওই সময়ের যে বাস্তবতা- মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ তখন ভূলুন্ঠিত, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়, সব জায়গায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে; মুক্তিযুদ্ধ যারা করছেন, তারা খুব অসহায়ের মতো সবকিছু দেখছেন, প্রতিবাদ করতে পারছেন না। এই বাস্তবতাটা কিন্তু আমি আমার প্রথম ছবি ‘আগামী’তে তুলে আনার চেষ্টা করলাম। এবং সেখানে আমি দেখালাম যে একটি ছোট্ট ছেলে প্রতিবাদ করছে, যার জন্ম হয়েছে ১৯৭১-এ এক মুক্তিযোদ্ধার ঔরসে। এবং সে-ই আগামী দিনের যোদ্ধা। ছোট্ট একটা ঢিল মেরে সে প্রতিবাদ জানাচ্ছে রাজাকারদের প্রতি।

এটা খুব দুরূহ কাজ ছিল কিন্তু! এই ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করাটা। তানভীর মোকাম্মেল যে বানালেন ‘হুলিয়া’- সেটারও কিন্তু একইরকম বিষয় ছিল। এই ধরণের বিষয় নিয়ে কাজ করাটাই কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জ ছিল।

যে কারণে আমার ‘আগামী’ ছবিটা  সেন্সরবোর্ডে আটকে দিল। বলা হলো, সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আছে, বাচ্চাটা ‘জয় বাংলা’ বলছে- সেটা কাটতে হবে! এবং ‘পাকিস্তানি মিলিটারি’ বলা যাবে না, বলতে হবে- হানাদার বাহিনি।

এগুলো যখন বলা হলো, আমি কিন্তু মানলাম না। প্রতিবাদ করলাম এবং ভালো একটা আন্দোলন গড়ে তুললাম। আমার মনে আছে, ৫২ জন বুদ্ধিজীবির একটা বিবৃতি ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন পত্রিকার প্রথম পাতায়, ‘আগামী’কে মুক্তি দিন- এই শিরোনামে। তারপরেই কিন্তু সরকার বাধ্য হলো একে মুক্তি দিতে।

আমরা তো সিদ্ধান্ত নিলাম ১৬ মিলিমিটারে ছবি বানানোর। ১৬ মিলিমিটারে ছবি নির্মাণের ব্যয় কম এবং যেকোনো জায়গায় ছবিটা দেখানো যায়। কারণ আমরা বুঝতে পারছিলাম, আমাদের ছবিগুলোকে সিনেমা হলের মালিকেরা তো দেখাবে না। কারণ, তখন আমি দেখছিলাম, বেশ কিছু ভালো ভালো ছবি মুক্তি পাচ্ছিল, কিন্তু সিনেমা হলে দেখাচ্ছিল না। যেমন, ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’। ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’কেও এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল ঢাকায় মুক্তি পাওয়ার জন্য। আরেকটি ছবি ছিল- ‘মেঘের অনেক রং’। সেটি তিনদিন চালানোর পর হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতা আমরা অনুধাবন করেছিলাম এবং বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের ছবিরও একই ভাগ্য হবে।

সেইজন্য আমরা ১৬ মিলিমিটারে ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম, তাতে করে আমাদের ছবির প্রতি স্বাধীনতা থাকবে। এক অর্থে ছবির নির্মাণব্যয় কমবে। আরেক অর্থে ছবিটি আমরা যেকোনো জায়গায় দেখাতে পারবো, কারণ ১৬ মিলিমিটারের প্রজেক্টর হলো পোর্টেবল। ৩৫ মিলিমিটারের প্রজেক্টরের জন্য আমাদের সিনেমা হলেই যেতে হতো।

আর আমরা বানাচ্ছিলাম শর্ট ফিল্ম। শর্ট ফিল্মের কনসেপ্টও সেই অর্থে আমাদের এখানে দানা বাঁধেনি। শর্ট ফিল্ম কী জিনিস- সেটা অনেকেই বোঝেনা। শর্ট ফিল্ম আমরা বানাচ্ছিলাম, কারণ বড় ছবি বানানোর টাকা আমাদের নাই। আমরা ছোট ছোট ছবি বানাচ্ছিলাম।

আমাদের আশঙ্কা ছিল, এই ‘ছোট ছবি’ দর্শক দেখবে কিনা। কিন্তু ছবিগুলো যখন তৈরি হলো, তখন দেখলাম, প্রচুর দর্শকের সাড়া পাওয়া গেল। দর্শকেরা যেন এতোদিন অপেক্ষাই করেছিল এরকম ছবি দেখার জন্য!

‘আগামী’র প্রথম শোয়ের কথা আমার মনে আছে, এটা ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিলে। দুটো শো আমরা করেছিলাম, ১৬ ফেব্রুয়ারিতে। দুটি শোয়ের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে আমাদের তৃতীয় আরেকটি শো করতে হলো। তারপরেও আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে জায়গা দিতে পারলাম না। মানুষজন এসে ব্রিটিশ কাউন্সিলের দরজার কাঁচ ভেঙে ফেলেছিল!

পরে আমরা চলে আসলাম বড় জায়গায়- পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানেও দীর্ঘ লাইন দিয়ে দর্শক ছবিটি দেখতে আসলো। এবং ‘হুলিয়া’র ক্ষেত্রেও তাই হলো। পরে আমরা ‘আগামী’ আর ‘হুলিয়া’ একসাথে চালাতাম। এবং বাংলাদেশের সব জায়গায়- উপজেলা পর্যন্তও ‘হুলিয়া’ আর ‘আগামী’ একসাথে চলেছে।

আমি দেখলাম যে, আমার যে টাকা খরচ হয়েছিল ‘আগামী’ বানাতে, (মাত্র ৭০ হাজার টাকা, ২৫ মিনিটের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়ইট ছবি) তার কয়েকগুণ টাকা ফেরত এসেছিল দর্শকের কাছ থেকে! এই ধরণের সাফল্য আমরা পেয়েছিলাম।

এদেশের সিনেমায় দুটো ভাগ এখন খুব স্পষ্ট। একটি হলো বাণিজ্যিক, যেটিকে সবাই মূলধারা বলছে; দ্বিতীয়টি শৈল্পিক, যেটিকে সবাই বিকল্প ধারা বলছে। স্বাধীনতার আগেও এই বিভাজন অতোটা ছিল না, জহির রায়হান কিংবা আলমগীর কবীরদের ছবি শৈল্পিক হলেও সেগুলো মূলধারারই ছিল। আপনাদের সময় থেকেই এই বিভাজন খুব স্পষ্ট হলো। এটা কেন হয়েছিল বলে আপনি মনে করেন?

মোরশেদুল ইসলাম: দুটি কারণে। একটি হলো, এর আগেও বাংলাদেশে শৈল্পিক সিনেমা হয়েছে, কিন্তু সেই ছবিগুলো ছিল একেকটা স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা। আলমগীর কবীর যেমন সিনেমা বানিয়েছেন, তারপরে ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’র মতো সিনেমা হয়েছে। জহির রায়হান বানিয়েছেন। সেই ছবিগুলোর সাথে মূলধারার ছবির সেই অর্থে কোনো দ্বন্দ্ব বা সংঘাত ছিল না।

জহির রায়হানের কথাই বলি, তিনি সবরকমের ছবি বানিয়েছেন। তিনি মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাই ছিলেন, ‘বাহানা’র মতো ছবি বানিয়েছেন, ‘বেহুলা’ বানিয়েছেন, যেগুলো খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। আবার ‘জীবন থেকে নেয়া’ বানিয়েছেন, ‘কাঁচের দেয়াল’ বানিয়েছেন, ‘কখনও আসেনি’ বানিয়েছেন। তো, সেইভাবে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি।

কিন্তু আমরা যখন থেকে ছবি বানিয়েছি, তখন কিন্তু একটা সম্মিলিত উদ্যোগে আমরা ছবি বানিয়েছি। ছবি তৈরিতে একটা কম্বাইন্ড ফোর্স তৈরি হলো, যেখানে একাধিক নির্মাতা একসাথে ছবি বানাতে শুরু করলেন, একইধরণের ছবি। আমাদের ছবিগুলো ছিল একটু ভিন্ন ধরণের। যেকারণে এগুলোকে পরবর্তীতে বিকল্প ধারার ছবি হিসেবে অভিহিত করা হলো।

কারণ এগুলো ছিল বিকল্পভাবে তৈরি। ঠিক এফডিসি কেন্দ্রিক ছবি না। বিকল্পভাবে তৈরি মানে- এটা ৩৫ মিলিমিটারে তৈরি হচ্ছে না, এটার শুটিং আমরা করছি একেবারে অন লোকেশনে, কোনো সেট তৈরি করে শুটিং হচ্ছে না, এটার প্রদর্শনটাও হচ্ছে বিকল্পভাবে। সিনেমা হলের বাইরে বিভিন্ন অডিটোরিয়াম ভাড়া করে। সুতরাং, একটা বিকল্প জায়গা তৈরি হলো চলচ্চিত্রগুলোর। একসঙ্গে অনেকে মিলে আমরা এটা করছি।

ছবিগুলোর বিষয়বস্তুর দিক থেকেও কিন্তু একটা পরিবর্তন এসেছিল। জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্য নির্ভর ছবি সেভাবে হয়নি। এর আগে সবগুলোই ছিল শৈল্পিক ছবি, কিন্তু কেবল জীবনের কথাই বলে- এরকম ছবি।

আমরা ছবি বানাতে শুরু করলাম  একেবারেই একটা রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে… তো এই সবকিছুকে মিলিয়েই আমাদের চলচ্চিত্রগুলো একটা আলাদা চরিত্র পেল। এই চরিত্রটা পাওয়ার ফলেই প্রথম থেকেই আন্দোলনটা খুব জনপ্রিয় হলো। ওই যে বললাম, প্রচুর লোক টিকেট কেটে ছবি দেখছে।  আমার প্রথম ছবিটাই একটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেল। দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটি ‘রৌপ্য ময়ূর’ পেল, সেরা পরিচালনার জন্য। এই অ্যাওয়ার্ডটা পাওয়ার ফলে কিন্তু আমার ছবির অনেক প্রচার হয়েছিল। সবগুলো পত্রিকায় এটা নিয়ে নিউজ হয়েছিল, এডিটোরিয়াল লেখা হয়েছিল ইত্তেফাকের মতো পত্রিকায়।

সবমিলিয়ে একটা বুস্ট আপ- একটা নতুন ধারার ছবির আন্দোলন শুরু হলো। আমাদের মূল ধারার  চলচ্চিত্রকারেরা এটাকে  একটা থ্রেট মনে করলো। আগের ছবিগুলোকে তারা থ্রেট মনে করেনি। কিন্তু আমাদের ছবিগুলোকে তারা সরাসরি একটা থ্রেট মনে করলো।

আরেকটা কারণ, আমরা সবাই কিন্তু ফিল্ম সোসাইটি করে এসেছি। আমি, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ- সবাই  ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের ফসল। আমাদের চলচ্চিত্র সংসদগুলোর ভূমিকা ছিল খুবই জোরালো। ব্যক্তিগতভাবেও আমরা বিভিন্ন সময় মূলধারার ছবিগুলোর যে সমস্যা, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতাম। তখন আবার বেশকিছু ছবিতে অশ্লীলতা, ভায়োলেন্স- এইগুলো ঢুকে পড়েছে।

আরেকটা কথা, আশির দশকের আগ পর্যন্তও  আমাদের মূলধারার ছবিরও একটা মান ছিল। সেগুলো জনপ্রিয় ছবি ছিল, মানুষকে আকৃষ্ট করার উপাদান থাকতো, কিন্তু সেগুলোও মানসম্পন্ন ছিল। এবং বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতাদের যদি আমরা অবস্থান দেখি, কারা তখন বাণিজ্যিক ছবি করছে? সুভাষ দত্ত, কাজী জহির- তাদেরও  একটা মান ছিল। শিক্ষিত এবং মানসম্মত লোক- তারই  তখন বাণিজ্যিক ছবি নির্মাণ করতো।

কিন্তু তারপর থেকে, অর্থাৎ আমরা যখন ছবি বানাতে শুরু করলাম, আমরা দেখলাম যে বাণিজ্যিক ছবিতে একটা ধ্বস নামতে শুরু করলো। এবং বাণিজ্যিক ছবি নির্মাণ করতে আসলেন এমন অনেকেই যারা আসলে ছবি নির্মাণের যোগ্যতা রাখেন না। সে কারণেই আসলে বাংলা ছবিতে অশ্লীলতা আসলো, ভায়োলেন্স আসলো এবং বাংলাদেশি ছবি তার স্বাতন্ত্র হারিয়ে ফেললো।

বাণিজ্যিক ছবির এই পচন নিয়ে আমরা  তখন সরব হয়েছিলাম। আমরা খুব কড়াভাবে কথা বলা শুরু করলাম। বিশেষ করে আমি তো্ বটেই। অন্যরা খুব ভদ্রভাষায় কথা বলতেন, আমি একেবারে ধুয়ে দিতাম!

তো এই জিনিসগুলো ওদের খুব অপছন্দ হলো। এবং এই যে নতুন ধারার সিনেমা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলো, আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেতে শুরু করলো- ওদের জন্য এটা থ্রেট মনে হলো। সেখান থেকেই দ্বন্দ্বটা তৈরি হলো।

এই দ্বন্দ্বটা দীর্ঘদিন চলেছিল, এখনও এটা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তবে এখন অনেকটাই এই দুই ধারা একটা সহাবস্থানে এসেছে… আমরা যখন ছবি বানাচ্ছিলাম শুরুর দিকে, মূলধারার নির্মাতারা আমাদের ছবিকে চলচ্চিত্রের স্বীকৃতিই দিতে চাইতো না। যেমন আমার ‘চাকা’ চলচ্চিত্রটি ফ্রান্সে যখন পুরস্কার পেল, তখন  বিশাল একটা আলোড়ন উঠেছিল। তখন এফডিসির পরিচালক সমিতির কয়েকজন এই ছবিটা দেখতে চেয়েছিল। ওদের কথা ছিল, কী এমন ছবি এটা- দেখি তো! তারা একটা ভিএইচএস ক্যাসেট জোগাড় করেছিল এটা দেখার জন্য। তো এটা দেখার পর নাকি বলেছিল,“এটা কোনো ছবি হলো নাকি! এটা ড্রেনে ফেলে দিয়ে আয়”!

আমাদের সঙ্গে তাদের মোটামুটি কথা বলাও বন্ধ ছিল একটা সময়। অনেক ঝগড়াঝাটিও হয়েছে, সেগুলো আরেক ইতিহাস। এখন কিন্তু তারা আমাদের আর ইগনোর করতে পারছে না। এটা হয়তো আমরা দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে তৈরি করতে পেরেছি।

ওরা আবার এটাও বলতো যে,“শর্টফিল্ম- এটা আবার কী জিনিস? আমাদের একটা ছবি তো দশটা শর্টফিল্মের সমান। ওরা দশটা ছবি বানানোর পরে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে আসুক!”

তারপরে আমরা ফুললেংথ ছবি বানাতে শুরু করলাম। ‘দীপু নাম্বার টু’ ফুললেংথ ছবি সে অর্থে। ‘চাকা’ও কিন্তু ফুললেংথ ছবি হিসেবেই সেরার পুরস্কার পেয়েছে। ওখানে সিক্সটি মিনিটসের বেশি হলেই ফুললেংথ। কিন্তু আমাদের দেশে তো নয়। সেই অর্থে ‘চাকা’কেও ওরা ফুললেংথ ছবি বলতে চাইছিল না।

‘দীপু নাম্বার টু’ ছিল আড়াই ঘন্টারও বেশি, দুই ঘন্টা ৩৪ মিনিটের ছবি, কিন্তু এতে কোনো গান নেই, কোনো ফাইট নেই। ওদের তো সাতটা গান, পাঁচটা ফাইট দিয়েই ১ ঘন্টার বেশি কেটে যায়। আমার ছবিতে তো সেসব কিছু ছিল না। আড়াই ঘন্টার বেশি আমি কেবল গল্প বলে ধরে রাখলাম দর্শকদের।

এই ছবিটা যখন বানালাম আমি, এফডিসিতে অনেকে ছবিটা দেখেছিল; যখন প্রথম এটার ট্রায়াল স্ক্রিনিং হচ্ছিল। এবং অনেকেই পছন্দও করেছিল। তারপর তো ছবিটা জনপ্রিয় হয়ে গেল। ভীষণ জনপ্রিয় হল। সিনেমা হলে চললো। এতোদিন তো আমাদের সিনেমা চলতো সিনেমা হলের বাইরে। তো এরপর থেকে তারা আমাদের কিছুটা সমীহ করতে শুরু করলো।

তখন  আর আমাদের ছবি বিকল্প ধারার রইলো না। আমরা তখন ৩৫ মিলিমিটারেই ছবি বানাতে শুরু করলাম। বিকল্প ধারার না থাকলেও আমাদের ছবির যে চরিত্র কিংবা বৈশিষ্ট্য- সেগুলো  একই রয়ে গেল।

তো এইভাবে ধীরে ধীরে দ্বন্দ্বটা  স্তিমিত হয়ে গেল…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *